মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩, ২০২৬
spot_img
Homeসদস্যদের লেখা ও শিল্পকর্মশ্রমের মর্যাদা কোথায়? পোশাকশ্রমিক থেকে গৃহকর্মী—সবার চাই ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা ও অধিকার

শ্রমের মর্যাদা কোথায়? পোশাকশ্রমিক থেকে গৃহকর্মী—সবার চাই ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা ও অধিকার

এ্যাডঃ মোঃ ইয়ারুল ইসলাম

একটি দেশের অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি তার শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, শ্রম ও অবদানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কৃষক মাঠে ফসল ফলান, পোশাকশ্রমিক বিদেশে দেশের সুনাম ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখেন, নির্মাণশ্রমিক গড়ে তোলেন নগর-জনপদ, শিল্পশ্রমিক সচল রাখেন উৎপাদনব্যবস্থা, আর গৃহকর্মীরা নীরবে সামলে রাখেন অসংখ্য পরিবারের দৈনন্দিন জীবন। ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ প্রতিটি খাতেই রয়েছে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের অবদান। অথচ প্রশ্ন হলো—যাঁদের শ্রমে অর্থনীতির চাকা ঘোরে, তাঁদের জীবনমান কতটা নিরাপদ ও সম্মানজনক?

শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি নতুন নয়। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। এটি অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। তবে শ্রমিক অধিকারের আলোচনা শুধু পোশাকশিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। কারণ, পোশাকশ্রমিকের পাশাপাশি গৃহকর্মী, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁকর্মী, ক্ষুদ্র শিল্পের শ্রমিক এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষেরাও একইভাবে ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিদার।

আমাদের সমাজে গৃহকর্মীদের অবদান সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত ক্ষেত্রগুলোর একটি। তাঁরা দিনের পর দিন অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি, অসুস্থতাজনিত ছুটি কিংবা ন্যায্য পারিশ্রমিকের নিশ্চয়তা থাকে না। কোথাও কোথাও তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। অথচ গৃহকর্মীরাও শ্রমজীবী মানুষ। তাঁদের শ্রমেরও মূল্য রয়েছে। তাঁদের সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

কৃষিশ্রমিকদের অবস্থাও বিবেচনার দাবি রাখে। মাঠে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে যাঁরা ফসল উৎপাদনে সহায়তা করেন, তাঁদের অনেকেই মৌসুমি কাজ, অনিশ্চিত আয় এবং কর্মসংস্থানের সংকটে ভোগেন। উৎপাদন খরচ বাড়লেও শ্রমের মজুরি সব সময় সেই অনুপাতে বাড়ে না। কৃষির সঙ্গে যুক্ত শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি, কাজের নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে নির্মাণ, পরিবহন, শিল্প ও বাণিজ্য খাতের শ্রমিকদেরও নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়। অনেক কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই, কর্মঘণ্টার নির্দিষ্ট সীমা মানা হয় না, আবার সময়মতো বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তাও থাকে না। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। তাই শুধু বেতন বাড়ালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, চিকিৎসাসেবা, বিশ্রাম, ছুটি, বিমা ও দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি মালিকপক্ষ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। সময়মতো বেতন প্রদান, অতিরিক্ত কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, সাপ্তাহিক ছুটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রম আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি তাঁদের ন্যায্য পাওনা। একজন শ্রমিক যেন তাঁর উপার্জনে পরিবারের খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় নির্বাহ করতে পারেন—এটুকু নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন। শ্রমিকের সন্তান যেন দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, অসুস্থ হলে যেন চিকিৎসা পায় এবং বার্ধক্যে যেন সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে না পড়ে, সেই ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তাঁর ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার যে নৈতিকতা, সেটিই একটি মানবিক সমাজের পরিচয়। শ্রমিককে অবহেলা করে টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। উৎপাদন বাড়বে, ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে, রপ্তানি আয় বাড়বে—কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল যদি শ্রমজীবী মানুষের ঘরে না পৌঁছায়, তাহলে উন্নয়নের পূর্ণতা আসবে না।

আমাদের দাবি একটাই—শ্রমের ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু শ্রমিকের অধিকার ভিন্ন হতে পারে না। পোশাকশ্রমিক থেকে গৃহকর্মী, কৃষিশ্রমিক থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্মী—সবাইকে ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক মর্যাদা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনতে হবে। শ্রমিকের অধিকার কোনো নির্দিষ্ট শিল্পের দাবি নয়; এটি দেশের প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার।

লেখক: মহাসচিব, বাংলাদেশ কংগ্রেস

- Advertisment -spot_img